সব পেশার লোক নেবে সৌদি আরব

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য সুখবর। এ দেশের মানুষের জন্য আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে সৌদি আরবের শ্রমবাজার। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দেড় বছর পর এবার সব খাতে কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। ফলে বিপুল পরিমাণ দক্ষ, অদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নার্স ও শিক্ষকের মতো পেশাজীবীদের নিয়োগের পথও সুগম হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই শ্রমবাজারে।
দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ রাখার পর ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সৌদি আরব। দেড় বছর ধরে নারী গৃহকর্মীদের পাশাপাশি শুধু গৃহ খাতেই শ্রমিক নিচ্ছিল সৌদি আরব। ১১ আগস্ট সব ধরনের কর্মী নিয়োগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিল সৌদি আরবের শ্রম ও সমাজ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি সফরে গিয়ে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর সূত্র ধরেই এল সুখবর। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহ্রিয়ার আলম বলেছেন, সরকারের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও তেলসমৃদ্ধ দেশটি বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়ার দুয়ার পুরোপুরি খুলে দিয়েছে।
জানতে চাইলে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে শ্রমবাজারের জন্য এটি বিরাট খবর। ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর গত দেড় বছর শুধু নারী গৃহকর্মী ও গৃহ খাতে বিশেষ করে চালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী খাতে পুরুষ নিচ্ছিল এই দেশ। এবার সব খাতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। ফলে নির্মাণশ্রমিকসহ সব খাতে সাধারণ কর্মীরা যেমন আসতে পারবেন তেমনি পেশাজীবীদের আসার পথও সুগম হলো। বিশেষ করে সৌদি আরবে বিপুল পরিমাণ চিকিৎসক ও নার্স লাগবে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ভালো খবর। প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফরের পরই এ সুখবরটি এসেছে। আশা করছি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক লোক যেতে পারবে।’
১৯৭৬ সালের ১৭ এপ্রিল ২১৭ জন শ্রমিক নিয়ে সৌদি আরবে আনুষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়। এসব শ্রমিকের সঙ্গে ৬৪ টন বাংলার কাদামাটি ও ৫০ কেজি নিমের বীজও পাঠানো হয়েছিল। সৌদি বিমান হিজবুল বাহারে করে পাঠানো এসব শ্রমিক দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়। এরপর প্রতিবছরই কর্মী যাওয়া বাড়তে থাকে।
১৯৭৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৩ জন বাংলাদেশি সৌদি আরবে গেছেন। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকেই নতুন করে ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। ফলে ২০০৭ সালে যেখানে ২ লাখ ৪ হাজার ১১২ জন ও ২০০৮ সালে ১ লাখ ৩২ হাজার কর্মী সৌদি আরবে যান, সেখানে ২০০৯ সালে মাত্র ১৪ হাজার ৬৬৬ জন কর্মী যান দেশটিতে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত একই অবস্থা ছিল।
.সৌদি আরবে কর্মী যাওয়া বন্ধ হওয়ার প্রভাবে জনশক্তি রপ্তানি অর্ধেকে নেমে আসে। সৌদি সরকার বাংলাদেশি কর্মীদের ইকামা (কাজের অনুমতিপত্র) বদলেরও সুযোগ বন্ধ করে দেয়। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন বাংলাদেশিরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে সৌদি আরব সফরে গিয়ে বাদশাকে আবার কর্মী নেওয়ার, ইকামা ও পেশা পরিবর্তন এবং সাধারণ ক্ষমার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। বন্ধ এই শ্রমবাজার চালু করতে সাবেক প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীও পাঁচবার সৌদি আরব সফর করেন। তিনি সৌদি শ্রমমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রিয়াদের তৎকালীন গভর্নরসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এ বিষয়ে তৎপর ছিলেন।
এ ছাড়া সৌদি স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল ২০১৩ সালের মার্চের শেষে বাংলাদেশ সফর করে। এরপর সৌদি সরকার ২০১৩ সালের ১০ মে থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সে দেশে বসবাসরত অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ইকামা ও পেশা পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। ৭ লাখ ৯৯ হাজার ১৮৬ জন বাংলাদেশি সাধারণ ক্ষমার এই সুবিধা পান। সাবেক প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গত বছরের ১৮ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সৌদি আরব সফর করে। এই সফরে তিনি সৌদি শ্রমমন্ত্রীর পাশাপাশি তৎকালীন ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স (বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স) মুকরিন বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সফরেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করা হয়।
এরপর গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সৌদি আরব। ২০১৫ সালে ৫৮ হাজার ২৭০ জন ও চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৬১ হাজার ৯৪৮ জন সৌদি আরব গেছেন।
কূটনৈতিক এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় গত বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে সৌদি আরব খুশি হয়। এরপর নিরসন হয় বাংলাদেশিদের ওমরাহ ভিসা নিয়ে জটিলতা। ইরানে সৌদি দূতাবাস ও কনস্যুলেটে হামলার তীব্র নিন্দা জানায় বাংলাদেশ। এরপর গত মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় আসেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল জুবেইর। আর জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরব সফরে যান। এরপর দুই দেশের পরিস্থিতি অন্য রকম হয়।
জনশক্তি রপ্তানিকারক ও সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, এখন সৌদি আরব বাংলাদেশের ব্যাপারে অনেক আন্তরিক। গত ৯ বছরে নতুন করে কোনো বাংলাদেশি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়নি সৌদি আরবে। তবে এবার বিপুলসংখ্যক নার্স ও চিকিৎসক নিতে চায় দেশটি।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৮ ও ১৯ নভেম্বর সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপমন্ত্রী আহমাদ বিন ফাহাদ আল ফায়াদ ঢাকায় অর্থনৈতিক কমিশনের সভায় (জেইসি) যোগ দেন। ওই বৈঠক শেষে আহমাদ বিন ফাহাদ আল ফুহাইদ বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে নার্স, চিকিৎসক ও শিক্ষকসহ দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শিগগিরই আমরা এসব পেশায় লোক নিতে চাই।’
দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, সৌদি সরকার তাদের নাগরিকদের উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জরুরিভাবে ১০ হাজার চিকিৎসক ও ২০ হাজার নার্স নিয়োগ এবং ২ হাজার ৯৫৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে সৌদিতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সভাপতি বেনজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার সৌদি আরব। এ পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করতে গেছেন। আমরা আশা করছি, সব ধরনের খাত উন্মুক্ত হওয়ায় আগামী কয়েক বছরে চার থেকে পাঁচ লাখ লোক সে দেশে যেতে পারবেন।’

You may also like...